সংরক্ষিত নারী আসন অসাংবিধানিক নয়, অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় চলছে
ফরিদা আখতার || Saturday 09 May 2026 ||
প্রতিদিন নারীরা নানাভাবে নির্যাতন, বৈষম্য ও অবমাননার শিকার হচ্ছেন। অথচ আমরা স্বাধীনতার পর থেকে সংবিধানের ৬৫(৩) ধারার কোনো পরিবর্তন আনতে পারলাম না।
শেষ পর্যন্ত নারী সংগঠনের দাবি অগ্রাহ্য করেই জাতীয় সংসদের ৫০টি সংরক্ষিত আসনে ‘মনোনয়ন’ দেওয়ার কাজ শেষ করেছে সরকারি দল বিএনপি এবং বিরোধীদলীয় জোট। পঞ্চাশটি আসন নিয়ে ভাগাভাগি হয়েছে আনুপাতিক হারে; বিএনপি পেয়েছে ৩৬টি আর বিরোধীদল হিসেবে জামাত ৮টি, এনসিপি ২টি, খেলাফত ও জাগপা ১টি এবং এক শহীদের মা-ও মনোনয়ন পেয়েছেন। মনোনয়ন বাছাই ইত্যাদি সেরে প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হবে ৩০ এপ্রিল। কোনো নির্বাচন নয়, নির্বাচনি আনুষ্ঠানিকতাই তাদের জন্যে করবে নির্বাচন কমিশন। ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশন দুই-একজনের মনোনয়ন স্থগিত বা বাতিলও করেছে। যেখানে ভোটের কোনো ব্যাপার নেই, জনগণের কোনো সম্পৃক্ততা নেই সেখানে এই আনুষ্ঠানিকতা হাস্যকর।
যারা মনোনয়ন পেয়েছেন তাদের অনেকেই চেনা মুখ। বিএনপির মনোনীত সদস্যদের মধ্যে ১০ জন আগেও সংরক্ষিত আসনে ছিলেন। তারা সে সময় ভালোই কথা বলেছেন এবং কাজ করেছেন সে সময়ে, তাদের সাথে আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই বলতে পারি। কিন্তু এটা বুঝতে পেরেছি যে সাধারণ আসনের সংসদ সদস্যদের তুলনায় তাদের ক্ষমতা সীমিত ছিল। নীতিনির্ধারণে তাদের গলার আওয়াজ শোনা যায়নি। দলীয় নেতাদের বক্তব্য শুনে টেবিল চাপড়ে দিন কাটাতে হয়েছে। তবুও আশা করি এখনও তারা সেই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ভালো অবদান রাখবেন। তাদের কাছে প্রশ্ন, তারা কি অন্তত উদ্যোগ নেবেন সংবিধানের ৬৫ (৩) ধারা সংশোধন করে আগামী ২০৩০ সালের নির্বাচনে সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা করার? এটির জন্য কি তাদের কণ্ঠস্বর আমরা শুনতে পারব?
যে কথা সব সময় বলা হয়- সংরক্ষিত নারী আসনে স্ত্রী-কন্যারাই চান্স পান, সেটা এবারও দুঃখজনকভাবে ঘটেছে। ঘটতেই হবে। কারণ এই আসনগুলোকে সান্ত্বনা, বা দলের পুরুষ সদস্যদের বোনাস হিসেবে আগেও দেখা হয়েছে, এবারও হলো। অন্তত ৭ জন দলের পুরুষ সদস্যদের পরিচয়ে মনোনীত হয়েছেন। তার অর্থ এই নয় যে স্ত্রী, কন্যা হলেই তারা যোগ্যতা রাখেন না। আমি সে কথা বলছি না। কিন্তু যখন স্বামীও সংসদ সদস্য, আবার স্ত্রীও সংরক্ষিত আসনে, কিংবা বাবা এবং শ্বশুর সংসদ সদস্য আর কন্যা-পুত্রবধুও সংরক্ষিত আসনে তখন মনে হয় পুরোটাই পারিবারিক কাজকারবার; এবং তা দৃষ্টিকটু লাগে বৈ কি! আরও অবাক করা বিষয় যে বিএনপির স্টান্ডিং কমিটির সদস্যরা যারা মনোনয়নের দায়িত্বে ছিলেন, তাদেরই আত্মীয় স্বজন বা পরিচিতরা মনোনয়ন লাভের সৌভাগ্য অর্জন করেছেন। তার চেয়েও আরো অবাক করা বিষয় হচ্ছে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী ৯০০ জন থাকলেও সদস্য মনোনয়নের এতোই আকাল পড়েছিল যে আওয়ামী লীগ সম্পর্কিত নারীও মনোনয়ন পেয়েছেন। এ বিষয়টি পত্র-পত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ আলোচনা হয়েছে। তবে বিএনপির পক্ষ থেকে এখনও কোনো বক্তব্য আসেনি। প্রশ্ন আসে তাহলে সাধারণ আসনেও কি আওয়ামী সম্পর্কিত সদস্য কেউ আছেন? নারী আসনে বসে আওয়ামী লীগের এই নেত্রীর ভূমিকা কী হবে আমরা কি জানি?
বিরোধীদলে জামায়াত এবং এনসিপির মনোনয়ন পেয়েছেন নিজ নিজ দলের নারী শাখার শীর্ষ স্থানীয় নেত্রীরা। খুব ভালো কথা। প্রশ্ন হচ্ছে জামায়াত যখন বলে যে সাধারণ আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি, তারা তৈরি নন বলে, তাহলে কি সংরক্ষিত আসনকে প্রশিক্ষণের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে? জামায়াতের নারী শাখার সদস্যরা কি সাধারণ আসনের যোগ্য নন? একই প্রশ্ন বিএনপিকেও করছি। বিএনপির যে দশজন আগেও সংরক্ষিত আসনে ছিলেন, তারা কেন সাধারণ আসনে মনোনয়ন পাননি? তাহলে বোঝা যাচ্ছে সাধারণ আসন হোক বা সংরক্ষিত- এটা একান্তই দলের নেতাদের ইচ্ছার ব্যাপার। তারাই যাকে যে কারণেই হোক মনোনয়ন দিতে পারেন। যোগ্যতার প্রশ্ন বা জনগণের পছন্দ অপছন্দ জানার দরকার নেই।
মনোনয়ন পেলে ভালো হয় এমন কয়েকজনের নাম আলোচনায় এসেছিল, যারা সাধারণ আসনে বিভিন্ন দল বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন, কিন্তু জয়লাভ করেননি। সাধারণ আসনে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য আমি তাদের সাধুবাদ জানাই। জেতাই আসল বিষয় নয়, নির্বাচনের অভিজ্ঞতা পেতে হলে জনগণের কাছে দ্বারে দ্বারে ভোট চাইতে জানতে হবে। সেটি তারা করেছেন।
সংরক্ষিত আসনে মনোনয়নের মাধ্যমে গিয়ে সংসদে বসে পাঁচবছর কাটিয়ে দিলে সে অভিজ্ঞতা কখনোই হবে না। বরং মনে হবে এটিই তো ভালো। দলের জন্য ভালো কাজ করে কোনোমতে সংরক্ষিত আসনে যেতে পারলেই তো হয়ে গেল। যাদের নাম আলোচনায় ছিল তারা হলেন ডা. মনীষা চক্রবর্তী, ডা. তাসনিম জারা, তাসলিমা আখতার, দিলশানা পারুল, সানজিদা আখতার তুলি প্রমুখ। এদের মধ্যে বিএনপি সানজিদা আখতার তুলিকে মনোনয়ন দিয়েছে। সানজিদার ভোট চাওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছে, এখন তিনি মনোনয়নে যাচ্ছেন সংসদে। এটি কতখানি মর্যাদাপূর্ণ সেটি তিনিই বিচার করবেন। তিনি বিএনপির মনোনয়ন গ্রহণ করেছেন। তাসনিম জারাকে কারা অফার করেছিলেন জানি না, তবে নিজের ফেসবুক পোস্টে জানিয়েছেন যে তিনি তা গ্রহণ করেননি। ধন্যবাদ জারা। তিনি সরাসরি নির্বাচনের দাবি তুলেছেন কাজেই মনোনয়নে সংসদ সদস্য হওয়া মোটেও মর্যাদাপুর্ণ নয়, এটিই তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন। এছাড়া অফার পেয়েও ফিরিয়ে দিয়েছেন বলে যার নাম শোনা যাচ্ছে তিনি হচ্ছে এনসিপির নেত্রী সামান্তা শারমিন। তাকেও ধন্যবাদ।
নারী আন্দোলন দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষিত আসনে নারী সদস্যদের সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচন দাবি করার পেছনে একটি বড় কারণ হচ্ছে, এই সদস্যদের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো ভৌগোলিক নির্বাচনি এলাকা থাকে না; তারা সংশ্লিষ্ট দল বা জোটের প্রতিনিধি হিসেবেই সংসদে পরিচিত হন। প্রতি ৬ জন সাধারণ আসনের সদস্যদের বিপরীতে একটি নারী আসন! এটি শুনতেও কষ্ট হয়। জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারী, অথচ এই নারী সংসদ সদস্যরা তাদের প্রতিনিধি হতে পারেন না। তাদের জেলাভিত্তিক দায়িত্ব দেওয়া হয়, সর্বোচ্চ দুটি জেলা উন্নয়ন তদারকি করতে পারবেন বলে জানা যায়। নারীদের স্বার্থ রক্ষায় তাদের ভুমিকা কী হবে? তবে হ্যাঁ, নারী আসনের সদস্যরা নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মতোই সমান স্ট্যাটাস ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবেন। তাদের বেতন, ভাতা, গাড়ির সুবিধা এবং প্লট বরাদ্দের অধিকার সাধারণ সংসদ সদস্যের মতোই। এটি কি সংসদে নারীদের যাওয়ার কারণ হতে পারে?
রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ, তাদের মাধ্যমে দেশের ৫১% নারীর প্রতিনিধিত্ব করা, তাদের পক্ষে দাবি দাওয়া তুলে ধরা খুব জরুরি। প্রতিদিন নারীরা নানাভাবে নির্যাতন, বৈষম্য ও অবমাননার শিকার হচ্ছেন। অথচ আমরা স্বাধীনতার পর থেকে সংবিধানের ৬৫(৩) ধারার কোনো পরিবর্তন আনতে পারলাম না। তারা সাংবিধানিক নিয়মেই মনোনীত হয়েছেন, কিন্তু সংবিধানের এই ধারা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে যায় না। তাই নারীরা পুরুষতান্ত্রিক এবং একটি অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থার নির্মম শিকার হয়ে রইলেন। আফসোস। তবে আমরা আশা করতে চাই যে, এই সংসদে সংবিধান সংশোধনের প্রশ্নে এই অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পরিবর্তন আসবে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য
প্রকাশিত: শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬। (সংরক্ষিত নারী আসন অসাংবিধানিক নয়, অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় চলছে)